অসি এবং বরুণার তীরে স্থিত শহর বারাণসী। দেবাদিদেব মহাদেবের ত্রিশূলে স্থিত শহর বারাণসী। সম্পূর্ণ পৃথিবী যখন প্রলয়ে তোলপাড় হয়ে যাবে, তখনও নাকি স্থির থাকবে বারাণসী, লোকমুখে শহর বেনারস বা বনারস।
বাঙালির চায়ের দোকান বা রোয়াকের আড্ডার মতন বেনারসের হল অড়ি; শব্দের উৎস খুঁজতে যাবেন না, পাওয়া মুশকিল। লোকমুখে প্রচলিত বনারস শব্দের উৎস নাকি "বনা রহে রস জিসকা!" এখন প্রশ্ন হল কোন রস? প্রাচীন নাট্যশাস্ত্র অনুসারে প্রধান রস হল ন'টি। রূপ গোস্বামীর মতে ভক্তের জন্য প্রধান রস হল পাঁচটি, যার সবকটিই এক ভক্তি রসে বিদ্যমান। বাবা বিশ্বনাথের আপন শহর, যেখানে পথচলতি মানুষ দেবালয়ে প্রস্তর রূপী দেবকে আশীর্বাদ করে "খুশ রহা! মৌজ করা!" বলে, যে শহরে তুলসীদাস রামচরিতমানস রচনা করেছিলেন, যে শহরে স্বয়ং হনুমান আসেন রামায়ণ গান শুনতে, সেখানে যে ভক্তি রসের প্রাবল্য হবে, তা তো বলাই বাহুল্য! কিন্ত বনারসের এই রস কিন্ত ভক্তি নয়। নবরসের বাইরে আরও নূতন রস সৃজন করেছেন বনারসের মানুষ, সেটি হল মৌজ!
মৌজ? মানে কী? ওই মৌজ-মস্তি মানে ছ্যাঁচড়ামো টাইপের তরল আনন্দ? নেশার ঘোর? আমেজ? যদি বলি এই সবই এবং আরও অনেক কিছু, কী বুঝবেন? এই নগরের অধিষ্ঠাতা দেব হলেন শ্মশানবাসী ভূতনাথ। তিনি গাঁজা টানেন, চিতা ভস্ম গায়ে মাখেন, পোশাক-পরিচ্ছদের দায় নেই, ভদ্রতা বা ফর্মালিটির ধার ধারেন না। শাস্ত্র দেখাবেন না। বেদ উদ্ধৃত করবেন না। আমার শিব, কাশীর বিশ্বনাথ লোকায়েত। যে কোনও সময়ে "বাবা!!!" হুঙ্কার দিয়ে তাঁর সঙ্গে ঝগড়া করা যায়। তিনি ভিখারীর বেশে মা অন্নপূর্ণার সামনে হাত পেতে দাঁড়ান। তিনি বনারসের বাবা।
এ হেন শহরের মানুষ যে অষ্টপ্রহর আমেজে থাকবে, সে কি আশ্চর্যের কথা! সোনারপুরায় একই সঙ্গে ট্রাফিক জামে আটকে থাকে ষাঁড়, রিকশা, চারচাকা, দুই চাকা। ষাঁড়ের গায়ে অনায়াসে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় সাইকেল সওয়ার। অধৈর্য চালকের বারবার হর্নে বিরক্ত না হয়ে নিরাসক্ত ভাবে উড়ে আসে বাক্যবাণ, "বহুতে জলদি হৌ কা? উড়ত বনs!"
সময়ের চেয়ে ধীর গতিতে বহমান এই শহর অস্ত্র হয়ে উঠতে সময় নেয় না। জানেন তো?
অঘোর মতের প্রতিষ্ঠাতা বাবা কীনারামকে বলা হয় মহাদেবের মানব অবতার। স্বয়ং দত্তাত্রেয় ছিলেন তাঁর দীক্ষাগুরু। এ হেন মহাপুরুষ যে দেবাদিদেবের ত্রিশূল স্থিত নগরীকেই নিজের লীলাক্ষেত্র এবং কর্মক্ষেত্র রূপে বেছে নেবেন সে তো বলাই বাহুল্য!
কথিত, একদা বাবা কীনারাম শিবালা ঘাটের উপর কাশী নরেশের নব-নির্মিত বিলাসমহলের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, সঙ্গে ছিল ওঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী কানা একটি গাধা এবং এক বয়স্ক হুলো বেড়াল। ওঁর এক পায়ে ছিল একটি ঘুঙুর, বোধকরি কোনও কৃতজ্ঞ বারবণিতার উপহার। বেনারসের নগরবধূ এবং বারবণিতাদের রক্ষাকর্তা ছিলেন উনি। এই পাঁচের দশক অব্দি শহরের তথাকথিত কুখ্যাত নারীরা লোলার্ক ষষ্ঠী এবং অন্যান্য তিথিতে ক্রিং কুণ্ডে ওঁর সমাধিতে পুজো দিত।
বিলাসমহলে তখন কাশী নরেশ নিজের ইয়ার দোস্তদের সঙ্গে নৃত্য গীতের আনন্দ উপভোগ করতে মগ্ন ছিলেন। হঠাৎই তাল ভঙ্গ হল বেসুরো গাধা এবং বেড়ালের ডাকে। ক্রুদ্ধ রাজা আদেশ দিলেন গাধা আর বেড়ালটিকে গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলতে। সিপাহিরা আদেশ পালন করতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। তাদের সামনে ছিলেন বাবা কীনারাম।
রাজা স্বয়ং এলেন অপরাধীকে দণ্ড দিতে; উপহাস করলেন প্রায় নগ্ন সন্ন্যাসীকে। অঘোরীর অভিশাপে নেমে এল কাশী রাজবংশের উপরে। চৈত সিংয়ের বংশ ধ্বংস হল। ওই বংশের কারুর মাথাতেই আর রাজমুকুট উঠল না। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হল তাঁর সাধের শিবালা মহল। আজও নাকি রাতের বেলা সেই মহলের ধারে কাছে কেউ ঘেঁসে না।
-
Weight390 g
-
No. of Pages190
-
BindingHardcover
-
Publishing Year2026
-
ISBN9788169435291
-
LanguageBengali
-
Publisher